কোরবানি কি - কোরবানির ইতিহাস - কোরবানি ঈদ ২০২৩ সম্পর্কে জেনে নিন


আপনি কি জানেন কোরবানি কি ? কোরবানি কাদের দেওয়া হয় এবং কেন দেওয়া হয়। আমরা জানি কোরবানির ইতিহাস খুবই প্রাচীন। আমাদের আদি পিতা আদম আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগ থেকেই মূলত কুরবানীর বিধান চলে আসছে। আজকে আমি আপনাদের কোরবানি সম্পর্কিত সকল বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করব।

কোরবানি কি - কোরবানির ইতিহাস - কোরবানি ঈদ ২০২৩ সম্পর্কে জেনে নিন

কোরবানি কি সেই সম্পর্কে পবিত্র হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোরবানি দেবে সে এত বেশি নেকি লাভ করবে, যত পশম ওই কুরবানীকৃত পশুর গায়ে আছে। আসুন জেনে নিই কোরবানি কি।

পোস্ট সূচিপত্রঃ কোরবানি কি - কোরবানির ইতিহাস - কোরবানি ঈদ ২০২৩ সম্পর্কে জেনে নিন

কোরবানি কি

আরবি করব বা কুরবান শব্দটি উর্দু ও ফার্সিতে কোরবানি নামের রূপান্তরিত হয়েছে। আর এর অর্থ হল আল্লাহর নৈকট্য বা সান্নিধ্য লাভ করা। আর এই কুরবানি শুরু হয়েছিল হযরত আদম আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মধ্য দিয়ে।

যাই হোক, কুরবানী পদ্ধতি সম্পর্কে যেটা জানা যায় সেটা হলঃ কাবিল ছিল চাষী। এবং তিনি গমের শীষ থেকে ভালোভাবে মালগুলো বের করে নিয়ে বাজে মালগুলোর একটি আর্টি কুরবানীর জন্য রেখে দিল। কিন্তু এদিকে হাবিল ছিল পশুপালনকারী। এবং সে তার পশুর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর দুম্বাটিকে কোরবানির জন্য রেখে দিল। এরপরে নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে কাবিলের কোরবানিটি ধ্বংস করে দিল। আর হাবিলের বাছাইকৃত দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং তা জানাতে বিচরণ করতে থাকে। পরবর্তীতে ইসমাইল আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ওই দুম্বা পাঠিয়ে জীবন বাঁচায়।

আরো পড়ুনঃ সুদ কি - সুদের ভয়াবহতা - সুদ হারাম হওয়ার কারণ জেনে নিন ২০২৩

কিন্তু কাবিল এই আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে হাবিলকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে এবং তিনি তার ভাইকে প্রকাশ্যে বলে আমি তোমাকে হত্যা করব। কিন্তু হাবিল তার ভাইয়ের কথার জবাবে মার্জিত ও সুন্দর নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করে বলে তুমি যদি তাকওয়া গ্রহণ করতে তাহলে তোমার কোরবানি ও গৃহীত হতো কিন্তু তুমি সেটা করোনি। তাই তোমার কোরবানি প্রত্যাখ্যান হয়েছে। কিন্তু এক পর্যায়ে কাবিল তার ভাইকে হত্যা করে ফেলে। এ থেকে বোঝা যায় যে কোরবানি কি এখন আমরা জানব কোরবানির ইতিহাস সম্পর্কে।

কোরবানির ইতিহাস

আমরা ইতিমধ্যে আগেই জেনেছি যে কোরবানির ইতিহাস অনেক প্রাচীন এবং পুরনো। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সকল যুগের সকল উম্মতের ওপরই কোরবানির বিধান ছিল। সূরা আল হাজ্বের ৩৪ নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির বিশেষ রীতি নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছি। যেন তারা আমার দেয়া পশুর উপর আল্লাহর নাম দিতে পারে। কিন্তু সব সময় সকলের উপর এক বিধান ছিল না। কারণ আমরা ইতিপূর্বেই জেনেছি যে আদম আলাই সাল্লাম এর যুগে তার পুত্র হাবিল ও কাবিল এর কোরবানি ইতিহাসের প্রথম কুরবানী বলে বিবেচিত। তার সময়ে কোরবানির পশুকে উপর থেকে একটি আগুন এসে পুড়ে ফেলত এবং কবুল না হলে যেভাবে জবেহ করত সেভাবেই পড়ে থাকতো।

হযরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার পরবর্তীতে কোরবানির পশুকে জবেহ করে কাবার সামনে অথবা কোন উপাসনালয়ে সামনে রেখে দিত। এক্ষেত্রে বর্ণিত আছে যে হযরত নূহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্তু জবাই একটি কুরবানীগাহ নির্মাণ করেছিলেন। আর সেখানে তিনি জবাইকৃত জন্তু আগুন জ্বালিয়ে দিতেন। আরব দেশে দুই ধরনের বলিদান বা বিশেষ ধরনের কুরবানী প্রথা চালু ছিল।

আরো পড়ুনঃ আকিকা শব্দের অর্থ কি - আকিকা দেওয়ার নিয়ম জেনে নিন

কিন্তু পরবর্তীতে বর্তমান প্রথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর মাধ্যমে প্রচলিত হয়। এটা মূলত হযরত ইসমাইল আলাইহি সালাম এর জানের বদলা বা ফিদিয়া। আল্লাহ তায়ালা তার পক্ষ থেকে বেহেশ্ত হতে একটি দুম্বা কোরবানির মাধ্যমে সমগ্র সামর্থ্যবান উম্মতে মোহাম্মদীর ওপর এ ফিদিয়া দেওয়া ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাহলে আমরা খুব সহজেই জানতে পারলাম যে কোরবানির ইতিহাস কি কুরবানী কি এবং কোরবানির সর্বপ্রথম কাদের উপরে হয়েছিল। এখন আমরা জানবো কোরবানি ওয়াজিব  হওয়ার শর্ত সমূহ

কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত

কোরবানি প্রত্যেক মালিকের তার নিছাবের ওপর ওয়াজিব করেছে। কোরবানির দিন সমূহে অর্থাৎ জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে 12 তারিখ পর্যন্ত জার নিকট সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য কিংবা তার সমপরিমাণ টাকা বা সম্পদ মজুদ থাকে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়।

কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত মোট চারটি যথাঃ

১. মুসলিম হওয়া

২. নিসা পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া

৩. আজাদ তথা দাস মুক্ত হওয়া

৪. মুকিম হওয়া, কিন্তু এক্ষেত্রে মুসাফিরের ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়

কোরবানির পশুর বয়স

আমরা জানি যে পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয় সেটা অবশ্যই সুস্থ সবল হতে হবে। কোন প্রকার শরীরে ক্ষত থাকা যাবে না। তাহলে জেনে নেওয়া যাক কোরবানির পশুর বয়স কত হওয়া প্রয়োজন। এবং একটি পশুর বয়স কত হলে সেটি কোরবানি বলে গণ্য হবে।

উটঃ ৫ বছর বা তার বেশি হতে হবে

গরুঃ দুই বছর বা তদূর্ধ্ব

ছাগলঃ এক বছর বা তদূর্ধ্ব

ভেড়াঃ ছয় মাস বা তদূর্ধ্ব তবে মনে রাখতে হবে যে ভেড়া ছাড়া অন্য কোন পশুর বয়স ৬ মাসের বাচ্চা কোরবানি কোন অবস্থাতে জায়েজ হবে না।

পশু কেনার সময় যা লক্ষ রাখা প্রয়োজন

কোরবানির পশু যেটাই হোক না কেন যেমন গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা মোটাতাজা ও স্বাস্থ্যবান হতে হবে। দুর্বল পশু দ্বারা কোরবানি করা মাকরুহ। এছাড়াও খেয়াল রাখতে হবে পশু যেন কোন প্রকার চর্ম রোগ দ্বারা আক্রান্ত না হয়। যে পশুর কান তিন ভাগের এক ভাগের চেয়ে বেশি কেটে গেছে, যে পশুর দাঁত সম্পূর্ণ পড়ে গিয়েছে, যে পশুর লেজ তিন ভাগের এক ভাগের চেয়ে বেশি নষ্ট হয়ে গেছে, যে পশুর পায় এমন ভাবে ভেঙেছে যে সোজা হয়ে হাঁটতে অক্ষম, যে পশুর চোখের দৃষ্টিশক্তি এতই কম যে ঘাস লতাপাতা ইত্যাদি দেখতে পাই না এই সকল পশু কোরবানি দেওয়া যাবে না।

কোরবানির পশু জবাই করার নিয়ম

কোরবানিদাতা তার নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবাই করবে। কারণ তিনি যেন ভালোভাবে জবাই করতে পারে। কেননা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের কোরবানি নিজেই জবাই করতেন। আর জবাই করা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের একটি বড় মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের উচিত নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবাই করা।

এ থেকে বোঝা যায় যে কোরবানি কি। কোরবানির পশু নিজে জবাই করা সবচেয়ে বেশি উত্তম কিন্তু কেউ যদি জবাই করার দায়িত্ব অন্যকে দেয় সে ক্ষেত্রেও জায়েজ আছে। কেননা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম তার জীবনে 63 টি কোরবানির পশু নিজ হাতে জবাই করেছিলেন, এবং বাকিগুলো জবাই করার দায়িত্ব আলী (রা.) কে দিয়েছিলেন। (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১২১৮)।

আরো পড়ুনঃ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন

কোরবানির পশু জবাই করার নিয়ম এর সময় খেয়াল রাখতে হবে, পশু যেন অধিক কষ্ট না পাই এবং সহজেই প্রাণ ত্যাগ করেন। পশুর প্রতি দয়া করা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করতে হবে। জবাই করার সময় অবশ্যই ধারালো ছুড়ি দ্বারা করতে হবে। কোরবানির পশু যদি উট হয় কিংবা এমন কোন পশু হয় যাকে আয়ত্ত করা সম্ভব নয় তাহলে তাকে বাম পা বাধা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে নরহ করতে হবে।

জবাই করার সময় পশুকে কেবলামুখী করে শয়ন করাতে হবে। জবাই করার সময় বিসমিল্লাহ বলতে হবে, কারণ বিসমিল্লা বলা ওয়াজিব। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন, যার উপর আল্লাহর নাম (বিসমিল্লাহ) উচ্চারণ করা হয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কর। (সুরা আন আম [৬] ১১৮)

এবং যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না তা হতে তোমরা আহার করো না কারণ এটা অবশ্যই পাপ। (সুরা আন আম [৬] ১২১) সবাই করার সময় বিসমিল্লাহর সাথে আল্লাহু আকবার যুক্ত করা মুস্তাহাব। জবাই করার পরে রক্ত প্রবাহিত হওয়া জরুরী। জবাই করার পরে প্রাণ ত্যাগ করার পূর্বে পশুর অন্য কোন অঙ্গ কেটে ফেলা হারাম। জবাই করার সময় পশুর মাথা যাতে বিচ্ছিন্ন না হয় তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে তা সত্ত্বেও যদি কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে তা হালাল হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তাহলে আমরা খুব সহজেই জানতে পারলাম যে কোরবানির পশু কিভাবে জবাই করতে হয়।

কোরবানির পশু জবাই করার দোয়া

বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার অর্থঃ আল্লাহর নামে আল্লাহ মহান। বিসমিল্লা-হি আল্লা-হুম্মা তাক্বাববাল মিন্নি ওয়া মিন আহলে বায়তি (আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ তুমি কবুল করো আমার ও আমার পরিবারের পক্ষ হতে)।

কিন্তু যদি কোরবানি অন্যের হয় তাহলে তার নাম মুখে বলতে হবে অথবা মনে মনে নিয়ত করে বলতে হবে বিসমিল্লা-হি আল্লা-হুম্মা তাক্বাববাল মিন আহলে বায়তিহি।(ব্যক্তির ও তার পরিবারের পক্ষ হতে)। এ সময় নবীর উপর দরুদ পাঠ করা মাকরূহ।

বিসমিল্লা-হি আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হুম্মা তাক্বাববাল মিন্নি কামা তাক্বাববালতা মিন ইবরাহিমা খালিলিকা (হে আল্লাহ! তুমি আমার পক্ষ হতে কবুল করো যেমন কবুল করেছ তোমার দোস্ত ইব্রাহিমের পক্ষ থেকে)। মাজমু ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ। যদি কেউ দোয়া ভুলে যায় বা ভুল হওয়ার ভয় থাকে তাহলে শুধু বিসমিল্লাহ বলে মনে মনে নিয়ত করলেই যথেষ্ট।

প্রিয় পাঠকগণ এমন আরো ইসলামিক পোস্ট পেতে আমাদের ওয়েবসাইটটি নিয়মিত ভিজিট করুন এবং আমাদের সাথেই থাকুন। এছাড়াও আমাদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন প্রকার পোস্ট লেখা হয়। এতক্ষণ সাথে থাকার জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

নিউ বাংলা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url