কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার জেনে নিন

  

কিডনি মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানা থাকলে অনেক সময় সুস্থ ভাবে জীবন যাপন করা যায়। অনেকেই কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। তাদের জন্য আজকের এই পোস্ট তাই ধৈর্যসহ করে সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়তে থাকুন এবং জানতে থাকুন কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সমূহ।

কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার - কিডনি ভালো আছে কিনা বোঝার উপায়

কিডনি মানবদেহে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে, এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরকে আস্তে আস্তে অকাজও করে ফেলে। এজন্য সবার উচিত স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বসবাস করা এবং নিয়মিত সঠিক সময়ে খাদ্য গ্রহণ করা। তাহলে দেরি না করে চলুন কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানি।

পোস্ট সূচীপত্রঃ কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার - কিডনি ভালো আছে কিনা বোঝার উপায়

কিডনি রোগ কি

অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন কিডনি রোগ কি? এবং কিভাবে এটি রোগ বিস্তার করে এবং শরীরের ছড়ায়। সাধারণত মানুষের শরীরে অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো কিডনি বাংলায় যাকে বৃক্ক বলা হয়। কিডনি রক্তে উপস্থিত দূষিত পদার্থগুলো পরিশোধন করে এবং মুত্রের মাধ্যমে সেগুলো দেহ থেকে বাহিরে বের করে দেয়। কিন্তু যখন এই কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন সমস্যার কারণে কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়ে তখন তাকে কিডনি রোগ বলে।

আরো পড়ুনঃ যৌন শক্তি বাড়ানোর প্রাকৃতিক উপায় - যৌনশক্তি বৃদ্ধির ১০ উপায়

কিডনি রোগ অনেক সময় কোন প্রকার উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধতে পারে। আর যখন কেউ এই রোগ ধরতে পারেনা এবং অকার্যকর কিডনির কারণে মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করে এবং ধুকে ধুকে মৃত্যুর কোলে ধাবিত করে। এজন্য আমাদের উচিত শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি কিডনিকেও সুস্থ রাখা।

কিডনি রোগের উপসর্গ ও লক্ষণ

প্রাথমিক পর্যায়ে যখন শরীরে কিডনি রোগ হয়ে থাকে তখন তেমন কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্রম কমতে থাকলে আস্তে আস্তে লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। যেমনঃ ক্ষুধামন্দা, ক্রমান্বয়ে শরীরে ওজন কমে যাওয়া, শরীরে বিভিন্ন জায়গায় অস্বাভাবিক হারে ফুলে যাওয়া, শরীরে পানি জমা, প্রসাবের পরিমাণ এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রসবের সাথে রক্ত বের হওয়া, ক্লান্তি বেড়ে যাওয়া, ঘুম কম হওয়া, মাঝেমাঝে অতিরিক্ত মাথা ব্যথা ইত্যাদি হয়ে থাকে। আর এগুলোই মূলত কিডনি রোগের উপসর্গ ও লক্ষণ

কিডনি কি কারণে অসুস্থ হয়

মানবদেহে দুটি কিডনি রয়েছে। আর এই কিডনি দেখতে সিমের আকৃতির মত হয়ে থাকে। প্রতিটি মানুষের মেরুদণ্ডের পাশে একটি করে পাঁজরের খাঁচার নিচে অবস্থিত যার প্রধান কাজ হচ্ছে শরীরের রক্তকে পরিশোধন করা এবং প্রসবের মাধ্যমে ভেতরের বর্জ্য অপ্রসারণ করা। অনেকেই প্রশ্ন করে থাকে কিডনি কি কারনে অসুস্থ হয়? তাদের প্রশ্নের উত্তর হল কিডনি বিভিন্ন কারণে অসুস্থ হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলোঃ

১. টাইপ ১ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের কারণে

২. উচ্চ রক্তচাপ

৩. কিডনি ফেইলার কিডনির বিকল

৪. কিডনিতে ইনফেকশন বা প্রসবের ইনফেকশন

৫. পাথর জনিত কিডনি রোগ

৬. জন্মগত কিডনি রোগ

৭. মুত্রথলিতে অস্বাভাবিকতা

৮. অটোইমুউন রোগ

৯. শ্বাসকষ্ট

১০. ত্বকের সমস্যা ও চামড়াতে চুলকানি

কিডনি ভালো আছে কিনা বোঝার উপায়

কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না যার কারণে খালি চোখে বোঝা যায় না কিডনি ভালো আছে কিনা। কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করলেও আস্তে আস্তে লক্ষণগুলো প্রকাশ হতে থাকে এবং কিডনির কার্যকারিতা হারাতে থাকে। তাই যাদের কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী, মূত্রথলিতে অস্বাভাবিকতা, ধূমপান, এছাড়া পরিবারে বংশ-পরম্পরায় কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে তাদের উচিত প্রতি বছর অন্তত দুইবার কিডনি রোগের দুটি সাধারণ পরীক্ষা করে নেওয়া। তাহলে আপনার কিডনি ভালো আছে কিনা সে সম্পর্কে অবশ্যই অবগত থাকতে পারবেন। এজন্য বিভিন্ন ডাক্তার কিডনি ভালো আছে কিনা বোঝার উপায় জানার জন্য দুটি করে পরীক্ষা করতে বলেন।

কিডনি রোগের পরীক্ষা সমূহ

যখন কোন ব্যক্তি মনে করেন তার কিডনিতে কোন সমস্যা হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত করে থাকে। সাধারণত আপনি চাইলে দুইটা টেস্টের মাধ্যমে বুঝতে পারবেন আপনার কিডনি নষ্ট হয়েছে কিনা। আর তাই 60 বছর পার হলে বছরে দুইবার কিডনি পরীক্ষা করা অবশ্যই জরুরি। কিডনি রোগের পরীক্ষা সমূহ এর মধ্যে প্রথম হলো প্রস্রাবের পরীক্ষা। কারণ মূত্র পরীক্ষা হলো এলবুমিন ও ক্রিয়েটিনিনের অনুপাত। এলবুমিন হল বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন। আর এই জন্য প্রসাবে এলবুমিন আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। বিশেষ করে আমাদের শরীরে যেমন প্রোটিন রয়েছে ঠিক তেমনি রক্তের মধ্যেও প্রোটিন রয়েছে। তবে এই প্রোটিন কখনোই মূত্রে থাকে না। কিন্তু এ সি আর পরীক্ষায় প্রোটিন পেয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে কিডনি ঠিকঠাক ভাবে রক্তকে পরিষ্কার করতে পারছে না। এজন্য ইউরিন টেস্টে প্রোটিন হলে নিশ্চিত হতে আবার এন এফ আর করতে হবে। এক্ষেত্রে যদি ৩-৪ সময় ধরে রেজাল্ট পজেটিভ আসতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরো পড়ুনঃ স্বপ্নদোষ থেকে মুক্তির উপায় - মাসে কতবার স্বপ্নদোষ হওয়া স্বাভাবিক

এরপর রক্তের পরীক্ষা, আমাদের শরীরে রক্তের একটা উৎপাদন হলো ক্রিয়েটিনিন। এজন্য রক্তে ক্রিয়েটিনিনের পরিমাণ, রোগীর উচ্চতা, বয়স ও ওজন এই কয়টি হিসাব থেকে একটি সমীকরণের মাধ্যমে কিডনি রোগের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা হয়ে থাকে। এবং তার ১০০ ভাগের মধ্যে কিডনি কত ভাগ কাজ করছে তার ওপর ভিত্তি করে কিডনি রোগীদের কে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথাঃ

১. প্রথম পর্যায়ে যাদের কিডনি কার্যকারিতা ৯০ ভাগের উপরে থাকে

২. দ্বিতীয় পর্যায়ে কিডনির কার্যক্ষমতা ৬০-৮৯ ভাগ

৩. তৃতীয় পর্যায়ে৩০-৫৯

৪. চতুর্থ পর্যায় ১৫-২৯

৫. সর্বশেষ পর্যায় যাদের কিডনির কার্যকারিতা 15 ভাগের নিচে

যাদের এই পাঁচ পর্যায়ের রোগীর মধ্যে আছে তাদের ক্ষেত্রে একমাত্র উপায় হল ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন করা। আর এই জন্য আপনাকে অবশ্যই রক্তের ক্রিয়েটিনিন থেকে পরীক্ষা করার মাধ্যমে জানতে হবে রোগী কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করলে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব। ইতিমধ্যেই আমরা কিডনি রোগের লক্ষণ জানতে পেরেছি এখন আমরা জানবো কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার।

কিডনি রোগের চিকিৎসা

যাদের কিডনি রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে তাদের অবশ্যই নেফোলজি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ঔষধ খেতে হবে। অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি পরিমাণ মতো সুষম খাদ্য খেতে হবে। এছাড়া ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার খেতে হবে। শারীরিকভাবে সতেজ থাকতে হবে এবং খুব জটিল কিডনি রোগের সমস্যা না থাকলে সপ্তাহে ২০-৩০ মিনিট করে এক্সারসাইজ করতে হবে। রাতে অবশ্যই ছয় থেকে আট ঘন্টা ঘুমাতে হবে। বিভিন্ন প্রকার ধূমপান, জর্দা, ফাস্টফুড ও অ্যালকোহলের মত খারাপ বদঅভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। ব্যথার ঔষধ সেবনের সময় সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। খুব বেশি আক্রান্ত জটিল কিডনি রোগীদের অবশ্যই ডায়ালাইসিস করাতে হবে।

কিডনি রোগের লক্ষণও প্রতিকার

যে সমস্ত মানুষদের কিডনিতে সমস্যা রয়েছে কিম্বা যারা ঝকির মধ্যে রয়েছেন তাদের রোগ মুক্তির জন্য বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা রয়েছে। কিডনি রোগের অন্যতম ঝুঁটির কারণ হলো ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ। আমাদের দেশের শতকরা 80 ভাগ কিডনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, এবং নেফাইটিস এর কারণে নষ্ট হয়ে থাকে। এজন্য যাদের  ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ আছে তারা নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী জীবন যাপন ও ওষুধ সেবন করার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের রাখা সম্ভব।

আরো পড়ুনঃ বাতের ব্যথার লক্ষণ - বাতের ব্যথা থেকে মুক্তির উপায়

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করে শরীরের অতিরিক্ত ওজন দ্রুত কমিয়ে ফেলতে হবে। যারা ধূমপান করে তাদের অবশ্যই ধূমপান ত্যাগ করতে হবে। এবং যারা খাবারের সময় কাচা লবণ ভাতের সাথে খেয়ে থাকে তাদেরও তাজা লবণ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এবং অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যাতে রক্তে কোলেস্টেরল স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। প্রতিদিন পরিমাণ মতো সবুজ শাকসবজি খেতে হবে। আর যারা কিডনি রোগে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং রুটিন মাপিক চেকআপ করানো। কিডনি রোগের আরো বেশ কিছু প্রতিকার রয়েছে যেমনঃ

১. নিয়মিত ব্যায়াম করা

২. ধূমপানের মত খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করা

৩. দিনে ছয় থেকে আট গ্লাস পানি পান করা

৪. অতিরিক্ত পেইন কিলার ঔষধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে

৫. দীর্ঘ সময় প্রসাব ধরে না রাখা

এতক্ষন আমরা কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার এবং কিডনি ভালো আছে কিনা বোঝার উপায় আরো অনেক কিছু সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমাদের বাংলাদেশ প্রায় 40 হাজার রোগের ধীরগতিতে কিডনি অকেজো হয়ে প্রতিবছর অকালে মৃত্যুবরণ করছে। একইসাথে কিডনি নষ্ট হলে ডায়ালাইসিস করে চিকিৎসা করার সামর্থ্য বাংলাদেশের কেবল ১০% মানুষেরও নেই। আর তাই আমাদের সবাইকে কিডনি রোগ সম্পর্কে জানতে হবে এবং অন্যকে জানানোর চেষ্টা করতে হবে তাহলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

নিউ বাংলা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url