ইসলামে বিয়ের নিয়ম - নতুন বউয়ের করণীয়

আমরা জানি পরিবার গঠনের পূর্বে শর্ত হলো বিবাহ করা। বিবাহ প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটি অপরিহার্য বিষয়। মুসলিম সমাজে বিবাহ হলো একটি ফরজ কাজ, প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ে করতে হবে। তাই আজকে আমরা জানবো ইসলামে বিয়ের নিয়ম কিভাবে পালন করা হয় এবং কি কি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই বিবাহ সম্পন্ন করা হয়।

ইসলামে বিয়ের নিয়ম - নতুন বউয়ের করণীয়

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো— তিনি তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জীবনসঙ্গিনী, যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। ’ (সুরা রুম, আয়াত :২১)। আর এই জন্য ইসলামে পরিপূর্ণ পরিবার গঠন এবং পরিবার গঠনের পূর্বশর্ত বিয়ে কিভাবে করতে হয় তার সকল প্রায়োগিক বিষয় আজকে তুলে ধরব

ইসলামে বিয়ের নিয়ম - নতুন বউয়ের করণীয়

ইসলাম হল পবিত্র ও শান্তির ধর্ম। ইসলাম মানুষকে শত সত্যের পথে চলার সঠিক নিদর্শক। এজন্য পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে যে ইসলাম মানুষকে শান্তি ও সুখের পথ দেখায়। আর ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি বিবাহ বন্ধন এর মাধ্যমে শারীরিক এবং যৌন চাহিদা পূরণ করে থাকে। একজন নারী তিনি একেক সময় একেকটা চরিত্রে দেখা যায় যেমন যখন কোন পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তখন সে সহধর্মিনী বা অর্ধাঙ্গিনী ঘরের গৃহকাজের গৃহিণী, সন্তানের জননী, সংসারের নানাবিধ কাজের একজন অভিভাবক আর তার সকল দিক বিবেচনায় একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

রমণীকে তার অর্থ, আভিজাত্য, রুপ সৌন্দর্য ও দ্বীনদার ধর্ম দেখে বিবাহ করা হয়। কিন্তু তুমি দ্বীনদারকে পেয়ে কৃতকার্য হও তোমার হস্ত ধুলি ধুসরিত হোক। এছাড়াও আরো বলেন তোমরা অধিক প্রেমময়ী অধিক সন্তান দানকারী রমণী বিবাহ করো কারণ যে নারী যত বেশি সন্তান দানকারীর ক্ষমতা থাকবে তত উম্মতের সংখ্যা বেশি হবে এবং আমি তোমাদেরকে নিয়ে কেয়ামতের অন্যান্য উম্মতের সামনে সংখ্যাধিক্যের ফলে গর্ভ করব।

ইসলামের বিয়ের নিয়ম বলতে পাত্রপক্ষের পারস্পারিক অবস্থা পরিবেশ ইত্যাদি দেখে জিজ্ঞাসা বাদ করে কোন পাত্রী পছন্দ হলে তার অভিভাবকের নিকট বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া। তবে তার পূর্বে অবশ্যই দেখে নেয়া উচিত যে সেই পাত্র বা পাত্রী উভয়ের জন্য গ্রহণযোগ্য কিনা।

মানুষের সহজাত যৌন চাহিদা পূরণ ও প্রজন্ম ধরে রাখার একমাত্র ইসলামসম্মত পদ্ধতি বিয়ে। বিয়ে একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। লোকচক্ষুর অন্তরালে দুজন নারী-পুরুষ একত্র হয়ে বিয়ে করতে পারেন না। এই জন্য নারী ও পুরুষ সম্মতিক্রমে সমাজের মানুষকে জানিয়ে বিয়ে করাই ইসলামের বিধান। এবং ইসলামের সর্বশেষ বিষয় হচ্ছে যে পাত্রী-পাত্রী দেখা ও নির্বাচন করা, দেনমোহর ধার্য করা, সর্বসাকুল্যে সম্মতি গ্রহণ, এবং বিবাহ সংগঠিত হবার পরে খাদ্য গ্রহণ করা ও মিষ্টান্ন বিতরণ করা ইসলামের বিধান।

ইসলামে বিবাহের রেজিস্ট্রি নিয়ম

ইসলামের পরিভাষায় রেজিস্ট্রি হলো বিয়ের লিখিত দলিল যেটির মাধ্যমে ছেলে এবং মেয়ের উভয়ের স্বাক্ষরিত বিষয় সংবলিত থাকে। বিয়ের রেজিস্ট্রি আমাদের দেশে একটি আইন রয়েছে, আর সেই রেজিস্ট্রি মোতাবেক বিবাহ স্বাক্ষরিত করা হয়। অর্থাৎ বিবাহ সম্পর্কিত আবশ্যক তথ্যবলি সরকারি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করাই হলো বিবাহ রেজিস্ট্রেশন। আর এই বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে বিয়ের পরে কেউ তার সত্যতা অস্বীকার করতে পারে না এবং স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর ভরণ পোষণ আদায় করতে সক্ষম হয়। এবং এই রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে স্বামী অথবা স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলে দুজনের মধ্যে যিনি বেঁচে থাকবেন তিনি মৃতের সম্পত্তি থেকে বৈধ অংশ ভোগ করতে পারবে।

রেজিস্ট্রেশন ফি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪০০০ টাকা পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন ফি ধার্য করা হয়। এছাড়া এই রেজিস্ট্রেশন ফি সরকার যেকোনো সময় পরিবর্তন করতে পারে। এবং প্রতিটি বিবাহের রেজিস্ট্রেশন বাবদ নিকাহ রেজিস্টার ২৫ টাকা কমিশন পায় এবং তিনি বিবাহের অনুষ্ঠানে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করালে যাতায়াত ভাতা বাবদ প্রতি মাইলে এক টাকা করে বরাদ্দ থাকে। আর এই বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ফি বরপক্ষ দিয়ে থাকেন। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরে রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে বিবাহ রশিদ প্রধান করে থাকে আর এই রশিদ ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের কাছে রাখা আবশ্যক কারণ, বিবাহ সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে সমস্যা হলে পরবর্তী সময়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া সহজ হয়।

দেনমোহর

ইসলামী পরিভাষায় মুসলিম বিয়েতে দেনমোহর হচ্ছে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর প্রাপ্ত একটি বিশেষ অধিকার। আর এই দেনমোহর মূলত স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারণ হয়। আর এই দেনমোহর বিভিন্নভাবে প্রদান করা হয়ে থাকে সেটি নগদ টাকা অথবা সমপরিমাণে স্বর্ণ বা অন্যান্যবাদী দিয়ে পরিশোধ করা যায়। কিন্তু কোন অবস্থায় স্বামী ন্যূনতম ১০ দিরহাম বা সমপরিমাণ অর্থ অপেক্ষা কম নির্ধারণ করতে পারবে না। বিয়ের পরে স্ত্রীকে অবশ্যই তার সঠিক দেনমোহর প্রদান করতে হবে অনেক সময় দেনমোহর নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। আবার অনেক সময় এটাও দেখা যায় যে বিবাহ বিচ্ছেদের সময় বলা হয় স্ত্রী নিজ ইচ্ছা থেকে নিজে উদ্যোগী হয়ে তালাক দিচ্ছে। এদের যুক্তি তুলে ধরা হয় যে স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে না এটি ভুল ধারণা কারণ স্বামী বা স্ত্রী যেই বা তালাক দিক না কেন দেনমোহরের টাকা অবশ্যই প্রদান করতে হবে। আর এক্ষেত্রে দেনমোহরের টাকা মাফ করা যায় তবে তার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। তা হলো দেনমোহর মাপ করতে গেলে স্ত্রীর পূর্ণ সমর্থন থাকতে হবে এবং কোন প্রকার পরশিত না হয়ে মাফ করে দিতে হবে কারো দ্বারা প্রবাহিত হওয়া যাবে না। তাহলে দেনমোহরের টাকা মাফ হওয়া সম্ভব।

দেনমোহর সাধারণত দুই প্রকার যথা:

১ তাৎক্ষণিক দেনমোহর: তাৎক্ষণিক দেড়মহর বলতে স্ত্রীর চাওয়া মাত্র সেটিকে পরিশোধ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে স্ত্রী তাৎক্ষণিক দেনমোহর না পাওয়া পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে সহবাস বা মিলন করা থেকে বিরত থাকতে পারবে।

আরো পড়ুন: ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদা সম্পর্কে জানুন

২ বিলম্বিত দেনমোহর: বিলম্বিত দেনমোহর হচ্ছে বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিশোধ করতে হয় আর এটাকেই বিলম্বিত দেনমোহর বলে। আর এই দেনমোহর সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রী বা স্ত্রীদের দাবি ক্রমে বিলোম্বিত দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।

 নতুন বউয়ের করণীয়

যখন একটি নারীর বিয়ে হয় তখন সে একটি নতুন জীবনের পদার্পণ করেন। ছোটকাল থেকে শুরু করে বড় হওয়া পর্যন্ত এক জীবন অতিবাহিত হয় কিন্তু বিবাহ হবার পরে সেই নারীর জীবনে এক অন্যরকম অনুভূতি জাগ্রত হয়। অনেক নারী রয়েছে যারা বিয়ের পরে অন্য একটি নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলতে অসুবিধা হয় তাই বিয়ের পূর্বে মানসিক প্রস্তুতি রাখা আবশ্যক। কারণ শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার আগে মাথায় রাখতে হবে যে সেখানকার পরিবেশ তার এতদিনের চেনা পরিবারের মতো থাকবে না সম্পূর্ণ আলাদা। যার জন্য মানসিক প্রস্তুতি আগে থেকেই নেওয়া দরকার আর এর জন্য উত্তম হলো আগেই থেকেই শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ নিয়ে স্বামী অথবা অন্য কারো কাছ থেকে ধারনা নিয়ে রাখা যেন পরবর্তী সময়ে সেই পরিবেশে মানিয়ে চলতে সুবিধা হয়।।

শ্বশুর বাড়ির মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলতে শিখতে হবে। এবং নিজের পরিবারের সঙ্গে যেভাবে মিশেছেন যেভাবে চলেছেন সেভাবে শ্বশুরবাড়ির পরিবেশের সাথেও মানিয়ে চলতে শিখতে হবে। শ্বশুরবাড়ির সকল বিষয়ে ত্রুটি বিচ্যুতি যেকোনো কিছু ভালো না লাগলে সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ভালো করে চলতে হবে মনে রাখতে হবে সব কিছুরই ভালো-মন্দ দিক রয়েছে। এজন্য সব সময় খারাপটাকে অপেক্ষা করে ভালো কিছুর দিকে মনোযোগী হতে হবে এবং ভালো কিছু ভাবতে হবে। অন্যের সমালোচনা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। শশুর বাড়ির কেউ অন্য কারো সমালোচনা করলে তাতে অবশ্যই আপনাকে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখবেন একজনের কথা অন্যজনকে বলা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। খারাপ আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে কারো আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকলে মনের মধ্যে পুষে রাখবেন না তবে সেটা এমনভাবে প্রকাশ করতে হবে যাতে সে ব্যক্তির মনে আঘাত না পেয়ে লজ্জা পাই এবং সে বুঝতে পারে যে আপনি কষ্ট পেয়েছেন তাহলে সে পরবর্তীতে নমনীয় ভাষায় কথা বলবে এবং ভালো ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যেন শুধুমাত্র শ্বশুরবাড়ি নয় যেকোনো পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে একটু সময় লাগে আর এই সময়টুকুতে আপনি আপনার নিঃসঙ্গতা ঠিক রেখেই যদি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারেন তবে সব সময় সব জায়গাতে নিজেকে ভালো জায়গায় দেখতে পাবেন। তাই প্রাথমিকভাবে সব জায়গাতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং সকল পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলতে শিখতে হবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

নিউ বাংলা আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url